সোমবার ০২ অক্টোবর ২০২৩

| ১৬ আশ্বিন ১৪৩০

KSRM
মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
১৫:৫৬, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

ইমরান চৌধুরী

প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা আজও উপেক্ষিত

প্রকাশের সময়: ১৫:৫৬, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

ইমরান চৌধুরী

প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা আজও উপেক্ষিত

বাঙালি একমাত্র জাতি যারা মাতৃভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে। তবে প্রাণের বিনিময়ে যে অর্জিত হয়েছে আজও সেই ভাষা উপেক্ষিত। বাংলা ভাষার চেয়ে ইংরেজিকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অফিস-আদালত প্রায় সবখানে মাতৃভাষার কোনো দাম নেই।

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম কর্মী আহসান উল্লাহ চৌধুরী মঙ্গলবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) তার নিজ বাসভবনে মহানগর নিউজকে এ কথা বলেন।

ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়ে এসময় তিনি বলেন, পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরেই ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। এদেশ পাকিস্তান হওয়ার ছয় মাস পর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ঘোষণা দেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এ ঘোষণার পরে এদেশের ছাত্র সমাজ এর প্রতিবাদ করে। জিন্নাহ চলে যাওয়ার পর প্রতিটি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই তার বক্তব্যের সমলোচনা করে। পূর্ব পাকিস্তানের লোকদের দমিয়ে রাখতেই তারা প্রথমে বাংলা ভাষার ওপর আঘাত হেনেছিল। পাকিস্তানিদের মনোভাব ছিল, ভাষা যদি কেড়ে নেওয়া যায়, তাহলে আমরা ওদের গোলাম হয়ে যাব। বড় বড় চাকরি ওরা নেবে আমাদের কিছু বলার থাকবে না। ক্ষমতা স্থায়ী করতেই বাংলা ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল তারা।

তিনি বলেন, ১৯৫২ সালে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে ঢাকার রাজপথে ছাত্র সমাজ যখন প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে তখন ফেনীতে আমরা এই দাবি সামনে নিয়ে আন্দোলনে নেমে পড়ি। ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকেই রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে গ্রামে গ্রামে আমাদের দাবি পোঁছানোর চেষ্টা করেছি। ভাষা আন্দোলনে ছাত্র সমাজের অগ্রণী ভূমিকা ছাড়াও গ্রামের কৃষক সমাজ এ আন্দোলনের সমর্থনে রাস্তায় নেমে পড়ে। সে সময় সকলের প্রাণের আন্দোলন ছিল এটা। 

আহসান উল্লাহ চৌধুরী বলেন, রাজপথে প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন নিয়ে বহু মিছিল মিটিং সংগঠিত করেছি। ওসব মিছিলে দেওবন্দ থেকে লেখাপড়া করা আলেম ওলামাদের সংগঠন ওলামা হিন্দ এর কর্মীরা যোগ দিতেন। ফেনী কলেজ সংলগ্ন আম গাছ তলে জমায়েত হয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানে মিছিল ও সমাবেশে চারপাশের স্কুলের ছাত্ররা, কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ নাগরিকগণও মিছিলে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন।

আলাপচারিতায় তিনি জানান, ফেনীতে ভাষা আন্দোলনের সময় যুব ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি ইমাদউল্লাহ ফেনীর আমতলায় সভা করে গেছেন। পরবর্তীতে একই স্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও সভা করেছেন। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে আবাল বৃদ্ধ জনতার মুখে ধ্বনিত হয়েছে ভাষার দাবি এবং শহীদ সালাম, বরকত, জব্বার ও রফিক হত্যার কথা। তাইতো এই ভাষা আন্দোলনের কথা ভুলবার নয়। এই স্মৃতি ও আন্দোলন এমনভাবে জীবনে মিশে আছে, আজো এই অহংকারের, গৌরবের ২১ ফেব্রুয়ারি এলে আমি সকালে শহীদদের স্মরণে শহীদ বেদীতে গিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করি।

বাংলার চাইতে ইংরেজি শিক্ষাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার ব্যাপারে এই ভাষা সৈনিক বলেন, সারা পৃথিবীতে বাংলা ভাষা স্বীকৃতি পেয়েছে। এটা আমাদের কাছে অনেক বড় পাওয়া। তবে আমাদের দেশের মানুষের চিন্তা ভাবনা এমন হয়ে গেছে, ইংরেজি না জানলে তাকে কেউ পাত্তা দিবে না। পৃথিবীতে এমন অনেক অনেক দেশ আছে যেখানে মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইংরেজি বলতে পারলেই নিজেকে বড় ভাবার কোনো কারণ নেই। যে সত্যিকারের মেধাবী সে বাংলা এবং ইংরেজি ঠিক মতো বলতে পারবে। আমরা ইংরেজি শিখবো। তবে সেইটা বাংলাকে উপেক্ষা করে নয়।

শ্রমিক নেতা, ভাষা সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রগতিশীল বাম রাজনীতিবিদ কমরেড আহসান উল্লাহ চৌধুরী ১৯৩৬ সালের ২৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন ফেনীর বালিগাঁও গ্রামে। ষাটের দশকে পরিবারের সাথে তিনি মিরসরাই উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের জনার্দনপুর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পিতা বদিউজ্জামান চৌধুরী ও মাতা রফিকুন্নেসা চৌধুরী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে জাপানীরা আহসান উল্লাহ চৌধুরীদের এলাকায় কয়েকবার বোমা বর্ষণ করে। তখনও আহসান উল্লাহ চৌধুরীর খুব একটা বুদ্ধি হয়নি। এসময় তিনি বড়দের সঙ্গে বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে রক্ষা পান। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষসহ নানা দূর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির সঙ্গে আহসান উল্লাহ চৌধুরীর পরিচয় ঘটে সেই শৈশবে। ফলে ব্যক্তিগত লোভ-লালসার উর্ধ্বে ওঠে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জীবনের বড় অংশ অতিবাহিত করেছেন এই বর্ষীয়ান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। শিক্ষা জীবন শুরু তাদের নিজস্ব জায়গায় প্রতিষ্ঠিত বোর্ড স্কুলে। তিনি ৫২ সালে ফেনীর ফুলগাজী থানার আলী আজম উচ্চ বিদ্যালয় হতে ঢাকা বোর্ডের অধীনে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ফেনী কলেজে ভর্তি হন উচ্চ মাধ্যমিকে। সে সময় কলেজে ছাত্র সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইউপিপি (ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ পার্টি) ও ইউএসএস (ইউনাইটেড স্টুডেন্ট সোসাইটি) নামে দুটি ছাত্র সংগঠন ছিল ওই কলেজে। ইউপিপি বাম প্রগতিশীল চিন্তাধারার এবং ইউএসএস ছিল দক্ষিণপন্থি পশ্চাদপদ চিন্তাধারার সংগঠন। তিনি ইউপিপির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন ও কলেজ ছাত্র সংসদের সহকারী সম্পাদক (সাহিত্য-সংস্কৃতি) পদে নির্বাচিত হন। আহসান উল্লাহ চৌধুরী চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। 

১৯৫৯ সালে তিনি কমিউনিষ্ট পার্টির সাথে যুক্ত হন। পরে চট্টগ্রাম বন্দরে বর্হিবিভাগে চাকরি নেন এবং পার্টির নির্দেশে চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে ব্রতী হন। চট্টগ্রামের শ্রমিক আন্দোলনকে জাতীয় স্বাধীকার সমবায় আন্দোলনের সাথে সম্পর্কযুক্ত করতে তিনি নিরলস এবং সাহসী নেতৃত্ব দেন। শ্রমিক আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে তাকে নানাভাবে দুর্ভোগ সইতে হয়েছে।

শৈশবে তিনি কৃষক নেত্রী ইলা মিত্র, আলজেরিয়ার মুক্তি সংগ্রামের নেত্রী জামিলা বুপাশাসহ বিভিন্ন সংগ্রামী নেতাদের জীবনী পাঠ করে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত হন এবং জীবনের বড় অংশটি ব্যয় করেছেন সক্রিয় রাজনীতিতে। তিনি বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত করা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে ৪০ বছরের বেশি অতিবাহিত করেছেন। তিনি স্বাধীনতার পর শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র চট্টগ্রামের সভাপতি ও কেন্দ্রের সহ-সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি চট্টগ্রামের সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন।

আইসি/এসএ/এআই