শনিবার ২৫ জুন ২০২২

| ১০ আষাঢ় ১৪২৯

KSRM
মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
১৮:১২, ১২ এপ্রিল ২০২২

হিমু বড়ুয়া

নগর ছাত্রদলে নতুন যন্ত্রণা ‘টপ ফাইভ’, গোপন বৈঠকে ঠিক হয় ‘মাইম্যান’ কমিটি

প্রকাশের সময়: ১৮:১২, ১২ এপ্রিল ২০২২

হিমু বড়ুয়া

নগর ছাত্রদলে নতুন যন্ত্রণা ‘টপ ফাইভ’, গোপন বৈঠকে ঠিক হয় ‘মাইম্যান’ কমিটি

নগর ছাত্রদলে নতুন যন্ত্রণা টপ ফাইভ

ঘরে-বাইরে নানা সংকটে দীর্ঘদিন থেকেই কোনঠাসা অবস্থায় আছে ছাত্রদল। বিএনপির এই ছাত্রসংগঠনের চট্টগ্রাম নগর শাখায় নতুন যন্ত্রণার নাম ‘টপ ফাইভ’ সিন্ডিকেট। আহ্বায়ক কমিটির পাঁচ শীর্ষ নেতার নতুন এই সিন্ডিকেটের গোপন বৈঠকে হচ্ছে বিভিন্ন ইউনিট কমিটি, এমন অভিযোগ এখন পদবঞ্চিতদের অনেকের মুখে। নতুন কয়েকটি ইউনিট কমিটি ঘোষণার পর থেকেই চলছে প্রতিবাদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালাময়ী পোস্টের পাশাপাশি রাজপথে হয়েছে প্রতিবাদী ঝাড়ু মিছিলও। 

জানা যায়, সম্প্রতি নগরীর ১৪টি কলেজ ও ১২টি থানায় কমিটি ঘোষণা করে নগর ছাত্রদল। এসব কমিটি নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন খোদ ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। এদিকে কমিটির ঘোষণার পরপরই কমার্স কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়কের স্বেচ্ছায় পদত্যাগ অভিযোগের তীরকে আরও শক্তিশালী করেছে।

ছাত্রদল নেতাদের অভিযোগ, অছাত্র, বিতর্কিত ও ছাত্রলীগ করেন, এমন ব্যক্তিদের নিয়ে করা হয়েছে ২৬টি ইউনিটের কমিটি। নগর ছাত্রদলের আলোচিত ‘টপ ফাইভ’ নেতার সিদ্ধান্তে করা হয় এসব কমিটি। যেখানে মাঠপর্যায়ে কাজ করা সাতটি সাংগঠনিক টিমের সদস্যদের মতামত নেওয়া হয়নি। যে কারণে বেশিরভাগ কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। 

তবে এ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে এতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ইন্ধন আছে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম নগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম। 

চট্টগ্রাম নগর ছাত্রদল সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ২৬ ডিসেম্বর নগর ছাত্রদলের ৩৫ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। তবে ঘোষণার কিছুদিন পর থেকেই সেই কমিটির পাঁচজন শীর্ষ নেতা নিজেদের কথিত ‘টপ ফাইভ’ বলে  আধিপত্য সৃষ্টি করার চেষ্টায় লিপ্ত হন। কিছু ক্ষেত্রে সফলও হন তারা। 

আলোচিত এই ‘টপ ফাইভে’র পাঁচ সদস্য হলেন- নগর ছাত্রদলের  আহ্বায়ক সাইফুল আলম, সদস্য সচিব শরিফুল ইসলাম তুহিন এবং প্রথম তিন যুগ্ম আহ্বায়ক এইচএম এম আসিফ চৌধুরী লিমন, তরিকুল ইসলাম তানভীর ও মো. সালাহ উদ্দিন (সাহেদ)। 

আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ২৬টি ইউনিট কমিটিতেও নিজেদের পছন্দের মানুষকে নেতৃত্বে এনেছেন তারা, আছে এমন অভিযোগও।

নগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা মহানগরনিউজকে বলেন, একটি কমিটির সবাই সমান। এখানে আলাদা করে টপ ফাইভ থাকা উচিত না। তারা ভাগাভাগির জন্য এধরনের কাজ করে যাচ্ছেন। কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও এই কথিত টপ ফাইভ নিজেদের আলাদা বলয় করতে চাচ্ছেন। তারা মাঠে কর্মীদের সংগঠিত না করে কমিটির নেতা নির্বাচনের বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। যার ফলস্বরুপ ইউনিট কমিটি নিয়ে আমরা সবাই টিম হয়ে কাজ করলেও, ঘোষিত কমিটিতে তাদের ‘মাই ম্যান’কেই রাখা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পদে। যে কারণে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অনেকের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকার পরও আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের মতো পদে আনা হয়েছে।

নগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমান মিঠু মহানগরনিউজকে বলেন, এত বছর পর কলেজগুলোতে কমিটি হলো। কিন্তু নগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব ভালো কমিটি দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। নতুন এসব ইউনিট কমিটি নিয়ে অনেক কর্মী অভিযোগ করেছেন আমাদের কাছে। তারা তাদের ত্যাগের মূল্যায়ন পাননি। নানা অসংগতি নিয়ে এসব কমিটি হয়েছে। আমরা সব ত্রুটি নিয়ে কেন্দ্রে অভিযোগ দিব। তারা যেভাবে সাংগঠনিক নির্দেশনা দেন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি  আরও বলেন, ইউনিট পর্যায়ের অনেক নেতা  আছেন, যারা মুখে অনেক বড় নেতা বলে আমাদের কাছে জাহির করে গেছেন। কিন্তু আমরা যখন মাঠে গিয়ে যাচাই-বাছাই করেছি, তখন দেখেছি কথার সঙ্গে সাংগঠনিক অবস্থানের কোনো মিল নেই। অথচ কমিটিতে তাদের ঠিকই পদে রেখেছেন আহ্বায়ক। আমি নগরীর ৯টি কলেজ নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছি। সেখানে কোনো গ্রহণযোগ্য কমিটি দিতে পারেননি তারা। আশা করেছিলাম ত্যাগী নেতাদের নিয়ে কমিটি হবে। কিন্তু আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন।   

এরআগে গত ৯ এপ্রিল (শনিবার) রাতে  নগরীর  ১৪টি কলেজ ও ১২টি থানার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন নগর ছাত্রদলের  আহ্বায়ক মো. সাইফুল আলম ও সদস্য সচিব শরিফুল ইসলাম তুহিন। তবে কমিটি ঘোষণার একদিনের মাথায় অছাত্র, বিতর্কিত নেতৃত্ব ও চট্টগ্রামের বাইরের ছাত্রকে নগরের কলেজের নেতৃত্বে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। 

এদিকে গত ১০ এপ্রিল রাতে নগরীর সরকারি কমার্স কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. মেহেদি হাসান (রায়হান) নিজের পদ ছাড়ার ঘোষণা দিলে (পদত্যাগপত্র দিলে) বিষয়টি নিয়ে বেশ জলঘোলা হয়। পদত্যাগপত্রে মো. মেহেদি হাসান লিখেন, ‘গত এপ্রিলে নবগঠিত ছাত্রদলের সরকারি কমার্স কলেজ শাখার  কমিটিতে আমাকে আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও আহ্বায়ক করা হয়েছে। আমি সদ্য বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ায়, ছাত্রদলের সাংগঠনিক যোগ্যতা হারাই। আমি ছাত্রদলের সাংগঠনিক সব কর্মকাণ্ডের দায়ভার নিতে সম্পূর্ণ অপারগতা প্রকাশ করে স্বজ্ঞানে ও স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকারি কমার্স কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক পদ থেকে পদত্যাগ করিতেছি।’

এছাড়া, চকবাজার থানা, বায়েজিদ থানা, পাঁচলাইশ থানা, খুলশী থানা, এমইএস কলেজসহ বেশ কিছু ইউনিটের কমিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচিত হয়। 

এদিকে নতুন ২৬টি ইউনিটের কমিটি নিয়ে বিতর্ক ও নির্বাচিত নেতাদের পদত্যাগের বিষয়টি মানতে নারাজ নগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম। তিনি মহানগরনিউজকে বলেন, আসলে কমার্স কলেজের আহ্বায়ক পদত্যাগ করেননি। আমরা ১৪টি কলেজের কমিটি দেওয়ার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কারণ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরও কলেজ কমিটিগুলো তারা পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি। আর আমরা দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পরও সুন্দরভাবে কলেজ কমিটিগুলো দিতে পেরেছি। এখানেই তাদের মাথাব্যথা। 

এসব অভিযোগ কমিটিকে বিতর্কিত করার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, কমার্স কলেজের আহ্বায়কের পদত্যাগের ঘটনাটি আমি যাচাই করে যা পেয়েছি, তা হলো- আগ্রাবাদ এলাকায় মো. মেহেদি হাসানের (রায়হান) বাবার একটি ক্রোকারিজের দোকান  আছে। তার বাবা তাকে দোকানে রেখে যখন নামাজ পড়তে যান, তখন কমার্স কলেজ ছাত্রলীগের ছেলেরা এসে তাকে ঘিরে ধরে। এসময় তার ওপর হামলা ও মারধরের হুমকি দেয় তারা। ছাত্রলীগ নেতারা কম্পিউটারে পদত্যাগপত্রটি টাইপ করে এনে জোর করে তাতে স্বাক্ষর নিয়ে ফেসবুকে আপলোড করায়।

সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি এটিকে পদত্যাগপত্র বলে মানছি না, কারণ সে যদি সত্যিই পদত্যাগপত্রটি লিখত, তাহলে পত্রের শুরুতেই বরাবর আহ্বায়ক লিখত। কিন্তু সে লিখেছে সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক বরাবরে। তাকে ভয়-ভীতি দেখানো হয়েছে। তার পরিবারের ওপরও নানা চাপ এসেছে। আমরা ইতোমধ্যে নগর ছাত্রদলের পক্ষ থেকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী হামলা ও হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিবাদমূলক বিবৃতি দিয়েছি।

অন্যদিকে নগরীর ওমরগণি এমইএস কলেজসহ আরও কয়েকটি কলেজের আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে সমালোচনার জবাবে নগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক বলেন, আমরা দীর্ঘদিন পরে সাংগঠনিকভাবে এ কমিটিগুলো দিতে পেরেছি। মূলত আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে বিতর্কিত করার জন্য আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এসব বলছে। আমরা সাতটি টিম গঠন করে গত কয়েকমাস ধরে সদস্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে কর্মী সম্মেলনও করেছি। এসব কাজের জন্য আমরা শুরু থেকেই টিম ভাগ করে দিয়েছিলাম। আমাদের টিম প্রধান ছিলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি কাজী রওনুকুল ইসলাম শ্রাবণ। তার নির্দেশনায় আমাদের বিভিন্ন টিম কার্যক্রম পরিচালনা করে।

‘টপ ফাইভ’ সিন্ডিকেট করে নগর ছাত্রদলে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার অভিযোগ প্রসঙ্গে সাইফুল ইসলাম বলেন, ছাত্রদল বড় সংগঠন হলেও নগরীতে ১৮ থেকে ২০ বছর কোনো কমিটি ছিল না। একটি অগোছালো ইউনিটকে গুছিয়ে আনতে গেলে আমার বাদ-বাকি সহকর্মীদেরও দরকার। আমরা সেই লক্ষ্যে টিম করে কাজ করেছি। সবাই আমাদের সহযোগিতা করেছে বিধায় আমরা এতগুলো ইউনিটে কমিটি দিতে সক্ষম হয়েছি।

শুধু পাঁচজন নেতা বসে কমিটি দিয়েছেন- এমন অভিযোগের উত্তরে তিনি বলেন, সাংগঠনিক টিমের কাজ ছিল গুছিয়ে দেওয়া। আমাদের তারা কর্মীদের সামগ্রিক তথ্য দিয়েছে। কে যোগ্য কে অযোগ্য সেসব তথ্যও দিয়েছে। তার ওপর নির্ভর করে আমরা পাঁচজন বসে কমিটি দিয়েছি। সবাইকে নিয়ে বসে তো একটি কমিটি করা যায় না। তারা আমাদের ৮০ ভাগ কাজ গুছিয়ে দিয়েছে। আর ২০ ভাগ বিভিন্ন তথ্যের ওপর নির্ভর করে আমরা কমিটিগুলো করেছি। সাংগঠনিক টিমের সবাই মাঠে কাজ করছে। তারা আমাদের যেসব তথ্য দিয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে আমরা এসব কমিটি দিয়েছি।

এদিকে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম নগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন মহানগরনিউজকে বলেন, অনেকদিন পর এসব ইউনিটে নতুন কমিটি হয়েছে। আমার কাছেও এসব কমিটি নিয়ে বেশ কিছু অভিযোগ আসছে। আমি সরেজমিন সেসব তদন্ত করছি। বাইরের এলাকার অনেকে পদ পেয়েছে। যেমন অনেকে আছে কোতোয়ালী থানায় পদ পেয়েছেন কিন্তু তারা ওই থানার বাসিন্দা না। এরকম নিজ থানার পদ না পেয়ে অন্য থানায় পেলে তাদের নাম বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছু কিছু অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করছি।  নতুন পদ পাওয়াদের এনআইডি যাচাই-বাছাই করা হবে। কে কোন থানায় আছে সেসব খতিয়ে দেখছি। এসব দেখা শেষ হলে আমি নগর ছাত্রদলের এসব সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে সাংগঠনিক মতামত ও সিদ্ধান্ত দিব।

জেডএইচ