শনিবার ২৫ জুন ২০২২

| ১০ আষাঢ় ১৪২৯

KSRM
মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
২০:৩২, ১২ মে ২০২২

হিমু বড়ুয়া

আধিপত্যের লড়াইয়ে ব্যস্ত চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগ, শীর্ষ দুই নেতার নেই ‘সুনজর’

প্রকাশের সময়: ২০:৩২, ১২ মে ২০২২

হিমু বড়ুয়া

আধিপত্যের লড়াইয়ে ব্যস্ত চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগ, শীর্ষ দুই নেতার নেই ‘সুনজর’

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের ইউনিট কমিটি নিয়ে ‘বিতর্ক’ যেন থামছেই না। সাড়ে আট বছরের পুরনো কমিটির নেতারা মত্ত কমিটি-পাল্টা কমিটি খেলায়। নগরীর ১৫টি সাংগঠনিক থানায় ইউনিট কমিটি গঠন করতে গেলেই দৃশ্যমান হয় ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সাপে-নেউলে সম্পর্ক। দেখা গেছে, গত একবছরে যতগুলো ইউনিট কমিটি হয়েছে তার বিপরীতে হয়েছে ততগুলো পাল্টা কমিটি। ফলে নগর ছাত্রলীগের নেতাদের সাপে-নেউলে সম্পর্ক ছড়িয়ে পড়েছে তৃণমূল ছাত্রলীগের মাঝেও। তাছাড়া দিনদিন থানা ও ওয়ার্ডে প্রকট হচ্ছে ছাত্রলীগের দুপক্ষের ‘সংকট’ ও আধিপত্যের ‘লড়াই’। 

নগর ছাত্রলীগের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, মূলত দায়িত্বশীল দুই নেতার বলয় ও আর্দশগত দ্বন্দ্ব, কমিটি নিয়ে সমন্বয়হীনতা ও বির্তকিত ‘মাইম্যানদের’ নিয়ে কমিটির দেওয়ার কারণে নগর ছাত্রলীগের এই হ-য-ব-র-ল অবস্থা। এছাড়া সারাদেশে বিভিন্ন ইউনিটে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নতুন নেতৃত্ব আনলেও চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের ইউনিটে নেই নতুন কমিটি। প্রায় নয় বছরের পুরনো নেতৃত্ব দিয়ে চলছে নগর ছাত্রলীগ। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় শীর্ষ দুই নেতার পক্ষ থেকেও নেই ‘সুনজর’।

এদিকে গত মঙ্গলবার (১০ মে) নগরীর ২১ নম্বর জামালখানে ওয়ার্ড কমিটি ও ৫ নম্বর মোহরা ওয়ার্ডে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু ও সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর। তবে সেই কমিটি ঘোষণার কয়েকঘণ্টার ব্যবধানে নগরীর সদরঘাট, চান্দগাঁও থানা, পূর্ব ষোলশহর, ৪ নম্বর চান্দগাঁও এবং ৫ নম্বর মোহরায় পাল্টা কমিটি ঘোষণা করেন নগর ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আবদুল খালেক ও যুগ্ম সম্পাদক মো. মইনুর রহমান। এই দুই ছাত্রনেতা নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী বলে পরিচিত।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর ইমরান আহমেদ ইমুকে সভাপতি ও নুরুল আজিম রনিকে সাধারণ সম্পাদক করে ২৪ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে বদিউজ্জামান সোহাগ ও সিদ্দিকী নাজমুল আলমের কেন্দ্রীয় কমিটি। ২৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয় ২০১৪ সালের ১১ জুনে। এর মধ্যে ২০১৮ সালের ২০ এপ্রিল মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি পদত্যাগ করলে জাকারিয়া দস্তগীরকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে তাকে ভারমুক্ত করে পূর্ণ সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বতর্মান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান নওফেলের অনুসারী। অন্যদিকে কমিটির শুরু থেকে শীর্ষ কয়েকজন সহ-সভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদকরা রয়েছেন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরের অনুসারী।    

এদিকে নগর ছাত্রলীগের কমিটির বয়স এখন প্রায় নয় বছরের ঘরে। এরমধ্যে সেই কমিটির বেশিরভাগ নেতারা হয়ে পড়েছেন অছাত্র ও বিবাহিত। অনেকে আবার মরিয়া হয়ে দৌঁড়াচ্ছেন নগর যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের  কমিটিতে পদের প্রত্যাশায়। ফলে দুই শীর্ষ নেতা বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কাজে স্বেচ্ছাচারিতা ও দুই বলয়ের আবদ্ধ থাকাসহ সমন্বয়হীনতার অভিযোগ রয়েছে।

বিগত এক বছরের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে পাওয়া তথ্য মতে, চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগ ৬টি কলেজ ও ১৫টি থানা ওয়ার্ড নিয়েই তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম। তবে এর মধ্যে কমিটি হয়েছে মাত্র ১২টি থানা, ১৩টি ওয়ার্ড এবং ৪টি কলেজের। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে একসাথে ১৩টি ইউনিটের কমিটি ঘোষণা করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ইমু-দস্তগীর। কিন্তু ঘোষণার পরপরই ১৩ ইউনিটের পাল্টা কমিটি দেন যুগ্ম-সম্পাদক ওয়াহেদ রাসেল ও সহ-সভাপতি মিথুন মল্লিক। তখন এই কর্মকাণ্ডের জন্য  কেন্দ্র থেকে বৃহিষ্কৃত হন এই দুই নেতা। পরে অবশ্য চলতি বছর তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয় কেন্দ্র। সাথে সেই পাল্টা ১৩ ইউনিটের কমিটিও সক্রিয় হতে দেখা গেছে। 

এছাড়া ২০২২ সালের শুরুতেই নগরীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে ছাত্রলীগের কমিটি নিয়েও পাল্টা কমিটি দেয় তৃতীয় আরও একটি পক্ষ। তারা শিক্ষা উপমন্ত্রীর অনুসারী হলেও ইমু-দস্তগীরের বলয় থেকে বের হয়ে এ পাল্টা কমিটি ঘোষণা করে। সর্বশেষ গত (১০ মে) মঙ্গলবার জামালখান ও মোহরা ওয়ার্ডে কমিটি ঘোষণা করে ইমু দস্তগীর। সেই কমিটির পরপর ফের পাল্টা কমিটি ঘোষণা দেয় সক্রিয় বিপক্ষ অংশটি। 

এদিকে চলতি বছরের শুরুতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নির্দেশনা ছিল নগরীর ওমরগণি এমইএস কলেজ ও সরকারি সিটি কলেজে তিন মাসের ভেতর কমিটি করার। কিন্তু সেই নির্দেশনা এখনও বাস্তব করতে পারেনি ইমু-দস্তগীর। 

সম্প্রতি পাল্টা কমিটি ঘোষণাকারী আ জ ম নাছির গ্রুপের নেতা ও নগর ছাত্রলীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মো. মইনুর রহমান মহানগর নিউজকে বলেন, নগর ছাত্রলীগে দীর্ঘদিন ধরে দুইটি গ্রুপ সক্রিয়। ইমু-দস্তগীর একটি বলয়ে আবদ্ধ করে নগর ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণে মরিয়া হয়ে পড়েছেন। কোনো থানা, ওয়ার্ডে কমিটি দিতে গেলে তারা আমাদের সাথে সমন্বয় করে না। বিভিন্ন ওয়ার্ডে থানায় আমাদের অনুসারী রয়েছে। তারাও সক্রিয় ছাত্রলীগ কর্মী ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র। কিন্তু এসব কমিটিতে তাদের বঞ্চিত করা হয়। অন্যদিকে তাদের করা ‘মাইম্যান’ কমিটিতে অস্ত্রধারী সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, মামলার আসামি ও বিএনপি পরিবারের সন্তানদের স্থান দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি।

তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নির্দেশনা ছিল নগরের কোনো ইউনিটে কমিটি না দিতে। তারা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে উপেক্ষা করে কমিটি দিয়েছে। তারা যদি নির্দেশ অমান্য করে ‘মাইম্যান’ কমিটি করতে পারে, তাহলে আমাদের ছেলেগুলো কেন বঞ্চিত হবে? তাদেরও অধিকার রয়েছে। তাই আমরা কমিটি দিয়েছি।

অন্যদিকে বছরের শুরুতে নগরীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে করা ইমু-দস্তগীরের ওয়ার্ড কমিটির বিরুদ্ধে পাল্টা কমিটি দেন আরেকটি পক্ষ। কিন্তু তারা শিক্ষা উপমন্ত্রী নওফেলের অনুসারী। 

সেই পক্ষের নেতা ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম সামদানী জনি মহানগর নিউজকে বলেন, বর্তমানে নগর ছাত্রলীগের কোনো মিটিং হয়না। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ থেকে ইউনিট কমিটি করা নিয়ে কোনো সঠিক নির্দেশনাও আমাদের জানা নেই। আমার ওয়ার্ডে পাল্টা কমিটি হয়েছে। কারণ, কোনো  সমন্বয় নেই। কমিটি দেওয়ার আগে ইমু-দস্তগীর আমাদের সাথে কোনো সমন্বয় করেনি। 

তিনি আরও বলেন, আমরা বারবার কেন্দ্রে জানিয়েছি নগর ছাত্রলীগের নতুন কমিটি গঠন নিয়ে। এখানে জটের কারণে রাজনীতির ময়দান থেকে অনেক মেধাবী নেতৃত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন্দ্র এটি কেন আমলে নিচ্ছে না সেটা আমার জানা নেই।

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ জাকারিয়া দস্তগীর এসব অভিযোগের জবাবে বলেন, আমরা ১৫টি সাংগঠনিক থানার অধীনে ওয়ার্ড কমিটিগুলো দিয়ে দিচ্ছি। এখন পর্যন্ত ১৩টি ওয়ার্ডে ও থানা এবং কলেজে কমিটি করেছি। যারা এর বাইরে কমিটি দিচ্ছে তাদের কোনো ভিত্তি নেই। তাদের কেউ চিনে না। আর এসব কমিটিকে পাল্টা কমিটিও বলা যাবে না। আমরা কেন্দ্রীয় নির্দেশনা মেনে খুব শীঘ্রই এমইএস কলেজ ও সিটি কলেজে কমিটি দিব। এবছরের মধ্যে সবগুলো থানা ও ওয়ার্ডে কমিটি গঠন করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

নগর ছাত্রলীগের এসব কমিটি ও পাল্টা কমিটির নিয়ে দুই পক্ষের লড়াই নিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি। তবে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ চৌধুরী মহানগর নিউজকে বলেন, আমি দীর্ঘদিন পরে আমার জেলা শহর রংপুরে  এসেছি। তবে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের এ সমস্ত কর্মকাণ্ড আমার নজরে এসেছে। কমিটি ও পাল্টা কমিটির বিষয়টিও আমি দেখেছি। আমি রাতে ঢাকায় ফিরবো। আমরা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে কথা বলে দ্রুত চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগকে একটি নির্দেশনা দিবো। 

এসএ