শনিবার ২৫ জুন ২০২২

| ১০ আষাঢ় ১৪২৯

KSRM
মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
২১:৫৬, ১৩ জুন ২০২২

হিমু বড়ুয়া

হঠাৎ জ্বরের প্রকোপ চট্টগ্রামে—রাইনো ভাইরাসের ছায়া দেখছেন বিশেষজ্ঞরা, টেনশন করোনা নিয়েও

প্রকাশের সময়: ২১:৫৬, ১৩ জুন ২০২২

হিমু বড়ুয়া

হঠাৎ জ্বরের প্রকোপ চট্টগ্রামে—রাইনো ভাইরাসের ছায়া দেখছেন বিশেষজ্ঞরা, টেনশন করোনা নিয়েও

দীপন সাহার (৫২) শরীরটা কয়েকদিন ধরেই ভালো নেই। একরকম হঠাৎ করে আসা হালকা জ্বর-সর্দি নিয়েই সকালে অফিসে যান তিনি। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে শরীরে অস্বস্তি ও কাশি বাড়ে তার। কাজ বন্ধ করে অফিস থেকে ছুটে যান নগরীর জেনারেল হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে তিনি বাসায় ফেরেন। তবে রাত বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে হয় ১০৩ ডিগ্রী। 

ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিয়ে কয়েকদিন পর তিনি একটু সুস্থ হলেও তার পরিবারের পিছু ছাড়েনি অসুখ। তার চার সদস্যের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও আক্রান্ত হন একই উপসর্গে। 

শুধু দীপন সাহার পরিবারই নয়, গত কয়েকদিনে নগরীর অনেক পরিবারকেই যেতে হয়েছে এই ভোগান্তির মধ্য দিয়ে। চলতি বছরের জুন মাসের শুরু থেকে শিশু থেকে বৃদ্ধ এমনকি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আক্রান্ত হচ্ছেন সর্দি-জ্বরে। একরকম হঠাৎ করেই শুরু হওয়া সর্দি, কাশি, মাথাব্যথা আর মাঝারি থেকে তীব্র জ্বরের কারণে অনেকেই তাই পড়ছেন অস্বস্তি এবং বিড়ম্বনায়। 

এদিকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, এক পরিবারের একজনের মধ্যে এসব উপসর্গ দেখা দিলে তা বাকি সদস্যের মাঝেও অনেকসময় ছড়িয়ে পড়ে। তবে ভাইরাসঘটিত এই রোগগুলোতে তেমন বেশি চিন্তার কারণ নেই। এ রোগ প্রতিরোধে কিছু নির্দেশনা ও নিয়ম-কানুন মেনে চললে সহজেই সুস্থ ও নিরাপদে থাকা যায়। 

অন্যদিকে এসব বিষয় নিয়ে বিশেষ সতর্কবার্তার কথা জানিয়েছে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়। করোনাভাইরাসের সঙ্গে এসব রোগের উপসর্গ মিল থাকায় রোগীর জটিলতা সৃষ্টির আগেই করোনাভাইরাসের টেস্ট করিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সরকারি এ সংস্থাটি।  

সোমবার (১৩ জুন) সকালে সরেজমিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সী মানুষ জ্বর-সর্দি-কাশি নিয়ে শরণাপন্ন হচ্ছেন চিকিৎসকের। তবে তাদের মধ্যে অধিকাংশ রোগীকেই হাসপাতালের ওয়ার্ডে ভর্তি হতে দেখা যায়নি। চিকিৎসকের কাছে পরামর্শ নিয়েই তারা ফিরেছেন ঘরে। 

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের শিক্ষক ডা. মুকেশ কুমার দত্ত মহানগরনিউজকে বলেন, সাধারণ সর্দি-জ্বর একপ্রকার ভাইরাসজনিত রোগ। যা আমাদের শ্বাসতন্ত্রের উপরিভাগে হয়ে থাকে বা Upper respiratory tract কে আক্রান্ত করে। সাধারণত রাইনো ভাইরাস নামের একপ্রকার ভাইরাস জ্বর-সর্দির প্রকোপ বাড়ার কারণ হতে পারে। সংক্রমণের ক্ষেত্রে এই ভাইরাস করোনাভাইরাসের মতো মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। তবে এটা একটু দুর্বল প্রকৃতির ভাইরাস। কারণ এটা ফুসফুসকে সেভাবে আক্রান্ত করে না। তাই বড় কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা তেমন একটা নেই বললেই চলে।

এ ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে তিনি বলেন, নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ হয়ে আসা, হালকা গলা ব্যথা, কাশি, জ্বর এগুলো এ রোগের অন্যতম উপসর্গ। জ্বর মোটামুটি ৯৯ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত ওঠা-নামা করতে পারে, মাথা ব্যথা, হাঁচি আসা, শারীরিক দুর্বলতা ইত্যাদি প্রাথমিকভাবে দেখা যায়। 

তবে তিনি সতর্কবার্তা জানাতেও ভোলেননি। তিনি বলেন, সর্দি-জ্বর থেকে অনেক সময় সেকেন্ডারি ইনফেকশন হয়ে থাকে। টনসিলাইটিস, মিডেল এয়ার ইনফেকশন বা অটাইটিস মিডিয়া হতে পারে। কানে ব্যথা করতে পারে। নিউমোনিয়া হতে পারে, একিউট সাইনোসাইটিস হতে পারে। অ্যাজমা রোগীদের অ্যাজমা অ্যাটাক হতে পারে। 

ডা. মুকেশ এসব রোগের প্রতিরোধ সম্পর্কে বলেন, এক পরিবারে একজনের সর্দি-জ্বর হলে কিছুক্ষেত্রে সবার তা হয়ে যায়। তাই প্রতিরোধের জন্য যা করতে হবে তা হচ্ছে, নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা চাই। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত সামগ্রী ব্যবহার না করা। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত গ্লাস ও অন্যান্য অনুষঙ্গ ব্যবহার না করা।

তিনি আরও বলেন, আমরা এখনও করোনা মহামারি থেকে পুরোপুরি মুক্ত হইনি। করোনাভাইরাসও ঠিক একইরকম উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত করে। তাই রোগীকে দ্রুত করোনা টেস্ট করিয়ে নেওয়া উচিত। যদি নেগেটিভ আসে কিংবা করোনার অন্যান্য লক্ষণ না থাকে তাহলে এসব সর্দি-জ্বরে সাধারণত চিকিৎসার দরকার হয় না। শুধুমাত্র উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসাই যথেষ্ট। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল আর সর্দির জন্য এন্টিহিস্টামিন ইত্যাদি দেওয়া হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ৭-২১ দিনের মধ্যে রোগী মোটামুটি সুস্থ হয়ে যায়।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী মহানগরনিউজকে বলেন, একই পরিবারের অনেকে যদি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে থাকেন এবং শারীরিক অবস্থা যদি খুব তাড়াতাড়ি খারাপ না হয় তাহলে তা ভাইরাসজনিত রোগ। অন্যদিকে জ্বর হওয়ার পরপরই রোগীর প্রেশার কমে যাওয়া, কাশি, শ্বাসকষ্ট বেড়ে যদি হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়, তাহলে তা ব্যাকটেরিয়াল রোগ।  তবে ঋতু পরিবর্তনের কারণেও ভাইরাসজনিত রোগে একই পরিবারের অনেকে আক্রান্ত হতে পারেন।

এক প্রশ্নের জবাবে সিভিল সার্জন বলেন, এখনও করোনা মহামারি নির্মূল হয়নি। তাই কারও যদি জ্বরের সঙ্গে কাশি-শ্বাসকষ্ট হয়, তাহলে তাকে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে। এছাড়া জুন-জুলাই মাসের দিকে ডেঙ্গু রোগের আশংকা থাকে। এরবাইরে অন্যান্য ভাইরাসেও মানুষ আক্রান্ত হন। রাইনো ভাইরাস, করোনা ভাইরাসসহ বিভিন্ন ভাইরাসে লোকজন আক্রান্ত হতে পারেন। যদি এরকম উপসর্গ ঘরে ঘরে দেখা যায়, তখন আমরা বিস্তারিত তদন্তের জন্য আইসিডিডিআর,বি কর্মকর্তাদের ডাকি। 

তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে এ বিষয়ে খোঁজখবর রাখছি। সার্বিক অবস্থা বুঝে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিব। 

জেডএইচ