শনিবার ২৫ জুন ২০২২

| ১০ আষাঢ় ১৪২৯

KSRM
মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
১৭:২০, ১৮ এপ্রিল ২০২২

ইফতেখার ইসলাম

বন্ধ চবিতে চলছে পদের ‘পাহারা’, ছাত্রলীগ কর্মীরা অপেক্ষায় হলের ঘরে

প্রকাশের সময়: ১৭:২০, ১৮ এপ্রিল ২০২২

ইফতেখার ইসলাম

বন্ধ চবিতে চলছে পদের ‘পাহারা’, ছাত্রলীগ কর্মীরা অপেক্ষায় হলের ঘরে

ছুটি শুরু হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ছুটি শুরু হয়েছে। তবে আবাসিক হলগুলো এখনও জমজমাট শিক্ষার্থীদের পদভারে। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের আভাস, চলতি মাসেই ঘোষণা করা হতে পারে চবি ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। মূলত এই কমিটিকে কেন্দ্র করেই এখনও হল ছাড়েননি পদপ্রত্যাশীরা। এদিকে বরাবরের মতোই চবির পূর্ণাঙ্গ কমিটিকে ঘিরে এবারও চলছে নওফেল-নাছির গ্রুপ সমীকরণ। তবে চবি ছাত্রলীগের একাধিক নেতার বক্তব্য, পদ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অন্যদিকে কমিটি ঘোষণার পর সংঘাতের আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।   

জানা যায়, কেন্দ্রীয়, চট্টগ্রাম নগর ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, ত্রিমুখী সমীকরণে এক অদ্ভুত অবস্থায় আছে চবি ছাত্রলীগ। নানা প্রতিবন্ধকতার বেড়াজালে নতুন কমিটি আসে দীর্ঘ বিরতির পর। আবার আংশিক কমিটি ঘোষিত হলেও তা পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগে কেটে যায় অনেকটা সময়। দুইয়ে মিলে পদ-পদবি ছাড়াই হতাশা আর ক্ষোভে ক্যাম্পাস ছাড়েন অনেক শিক্ষার্থী। তবে আশার কথা হলো চলতি মাসেই বর্তমান কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার আভাস দিয়েছেন চবি ছাত্রলীগের পদধারীরা। আর এই আশায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলেও হল ছাড়েননি অধিকাংশ নেতা-কর্মী। 

সাধারণত প্রতিবছর ১০ রমজানের আগেই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যান অধিকাংশ শিক্ষার্থী। বিশেষ করে যানবাহনের ঝামেলা এড়াতে দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীরা কিছুটা আগেই হল-ক্যাম্পাস ছাড়েন। এবার ১৭ এপ্রিল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। এর আগের দুইদিন ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। ইতোমধ্যে রমজানের অর্ধেক সময় পার হয়ে গেছে। তবুও হল ও ক্যাম্পাসে অবস্থান করছেন শিক্ষার্থীরা। 

সরেজমিন দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব কয়টি হলে শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। তবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন বা অতটা সক্রিয় নন, এমন শিক্ষার্থীরা ১০ রমজানের আগেই ক্যম্পাস ছেড়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রামের আশেপাশের অনেক শিক্ষার্থী বাড়িতে গেলেও আবার ফিরছেন ক্যাম্পাসে।

জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাহজালাল হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, মাস্টার্সের শেষপর্যায়ে আছি। আর কয়েকদিন পর ছাত্রত্ব আর থাকবে না। নেতারা চলতি মাসে কমিটি পূর্ণাঙ্গের আভাস দিয়েছেন। ছাত্রলীগের একটা পরিচয় পেতেই রমজানেও হলে অবস্থান করছি। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ রহমান হলের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, এক বছরের কমিটি তিন বছরের দ্বারপ্রান্তে। করোনার অজুহাতে নেতারা কমিটি পূর্ণাঙ্গ করেননি। এখন কমিটি দেওয়ার উপযুক্ত সময়। তাই আপাতত ক্যাম্পাসে অবস্থান করছি। 

চলতি মাসে পূর্ণাঙ্গ না হলে কমিটি বিলুপ্তির শঙ্কা

২০১৯ সালের ১৫ জুলাই রেজাউল হক রুবেলকে সভাপতি ও ইকবাল হোসেন টিপুকে সাধারণ সম্পাদক করে চবি ছাত্রলীগের দুই সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। তখন  দ্রুত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়। তবে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর পেরুলেও সেই কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি। মাঝখানে করোনা যেন আশীর্বাদ হয়ে আসে সভাপতি-সম্পাদকের জন্য। 

করোনা পরবর্তী প্রায় এক বছরের বেশি সময় বিশ্ববিদ্যালয় সচল রয়েছে। এর মাঝে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বগিভিত্তিক গ্রুপ-উপগ্রুপগুলো দফায় দফায় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার দাবি জানায়। আর পূর্ণাঙ্গ কমিটির ক্ষোভ থেকে ঘটেছে সংঘাতের ঘটনাও। 

এদিকে গত ১৩ জানুয়ারি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দুই সদস্যের প্রতিনিধি দল চবিতে আসেন। সেসময় আন্দোলনরত নেতা-কর্মীদের তোপের মুখে জোর গলায় ২৫ জানুয়ারির মধ্যে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার কথা জানান চবি ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদক। তবে সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর পার হয়েছে আরও দুই মাস। এখনও আশার বাণী শোনাচ্ছেন নেতারা। 

অন্যদিকে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চবি ছাত্রলীগে অসংখ্য নেতা-কর্মী থাকায় পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে অনেকের পদ না পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাগ-ক্ষোভে পদবঞ্চিতরা সংঘাতে জড়াতে পারেন। আর তা যদি বিশ্ববিদ্যালয় খোলা অবস্থায় হয় পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হতে পারে। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশে বিঘ্ন ঘটাবে। তাছাড়া রমজান মাসে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে নেই, শাটলেও তেমন চাপ নেই, বন্ধ রয়েছে ক্যাম্পাস। এমন পরিস্থিতিতে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হলে ঝামেলা হলেও তা ক্যাম্পাসে তেমন প্রভাব ফেলবে না। 

সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, যদি চলতি মাসে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা না হয়, তবে বড় সমস্যায় পড়তে হতে পারে চবি ছাত্রলীগের পদধারীদের। তারা ধারণা করছেন, চলতি মাসে কমিটি না হলে ঈদের পর বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সঙ্গে সঙ্গে তুমুল হট্টগোলে জড়াবে চবি ছাত্রলীগের গ্রুপগুলো। 

এদিকে ছাত্রলীগের ৩০তম সম্মেলন নিয়েও চলছে আলোচনা। এমন পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্তিরও আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীরা।

পূর্ণাঙ্গ কমিটি কতদূর

পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে ১৪শ’র বেশি নেতা-কর্মীর জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করেছে চবি ছাত্রলীগ। জানা গেছে, ক্যাম্পাসের রাজনীতি শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী, এই দুই ধারায় বিভক্ত। আর এই দুই পক্ষের মধ্যে আছে বেশ কয়েকটি উপ-পক্ষ। আর সব সমস্যার মূলে রয়েছে কোনো উপপক্ষের কতজন পদ পাবে সে সব ভাগাভাগি নিয়ে। কারণ এই পদ-পদবির ওপর ক্যাম্পাসে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার নির্ভর করে। 

চবি ছাত্রলীগের বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে,  কোন গ্রুপ থেকে কতজন পদ পাবে, সে বিষয়টি নির্ধারণ নিয়েই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে জট বেঁধেছে। যদি সর্বসম্মতিতে পদ নির্ধারণ হয়ে যায়, তাহলে খুব সহজেই কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়ে যেতে পারে। জানা গেছে, ছাত্রলীগের এক পক্ষ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে পদ-পদবির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলেও আরেক পক্ষ এখনও আগায়নি বেশিদূর। এমন পরিস্থিতিতে চলতি মাসে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হওয়া নিয়েও শঙ্কার শেষ নেই। 

জানতে চাইলে চবি ছাত্রলীগের বিজয় পক্ষের নেতা মো. ইলিয়াস মহানগরনিউজকে বলেন, এখনও মুখে মুখে কমিটি হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। নেতাদের সঙ্গে আলোচনাও হয়েছে। তবে কোন পক্ষ কতগুলো পদ পাবে বা কোন কোন পদগুলো পাবে সেই ফরম্যাট এখনও প্রস্তুত হয়নি। 

তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হওয়ার আগ পর্যন্ত কমিটির বিষয়টি শঙ্কামুক্ত নয়।

অন্যদিকে ভিএক্স পক্ষের নেতা প্রদীপ চক্রবর্তী দূর্জয় বলেন, আমরা আমাদের নেতা নাছির ভাইসহ সব পক্ষই আলোচনা করেছি। কোন গ্রুপ কয়টি পদ পাবে তা মোটামুটি নির্ধারিত হয়েছে। 

তিনি বলেন, নাছির ভাই কমিটির নাম নিয়ে ২০ তারিখের মধ্যে জমা দিতে বলেছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি কিছু ঘটনা ঘটায় ছাত্রলীগ নেতারা সেসব নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। 

এই ছাত্রলীগ নেতা আরও বলেন, যদি ঈদের আগে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে হয়, তাহলে ক্যাম্পাসের বৃহৎ দুই পক্ষের সব আলোচনা সেরে তিন-চারদিনের মধ্যে ঢাকায় যেতে হবে। অন্যথায় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব হবে না। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চবি ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল মহানগরনিউজকে বলেন, চলতি মাসেই চবি ছাত্রলীগের কমিটি পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে এটি শতভাগ সত্যি। আমরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়ার কাজগুলো করে যাচ্ছি। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটির জন্য সব পক্ষই যথেষ্ট সহযোগিতা করছেন। 

জানতে চাইলে চবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু বলেন, আমরা নেতাদের সাথে কথা বলে সবুজ সংকেত পেয়েছি। ঈদের আগে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়ার চেষ্টায় আছি। ২৬ থেকে ২৭ তারিখের পর আমরা কমিটির কাজে ঢাকায় থাকব। আশা করছি ঈদের আগের কয়েকদিনের মধ্যেই কমিটি পূর্ণাঙ্গ হবে। 

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ১৭ জুলাই সর্বশেষ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) শাখা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এরপর গত সাড়ে ৫ বছরে আর কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি চবি ছাত্রলীগের।

জেডএইচ