শুক্রবার ০৯ ডিসেম্বর ২০২২

| ২৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

KSRM
মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
১৭:৩০, ২৭ আগস্ট ২০২২

রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি

বাবা-মেয়ের পাল্টাপাল্টি ১ ডজন মামলা, নেপথ্যে কি?

প্রকাশের সময়: ১৭:৩০, ২৭ আগস্ট ২০২২

রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি

বাবা-মেয়ের পাল্টাপাল্টি ১ ডজন মামলা, নেপথ্যে কি?

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে নয়টি মামলা দায়ের করেছেন স্ত্রী ও মেয়ে। অন্যদিকে স্কুলশিক্ষিকা মেয়ে ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করেছেন বাবা। 

অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসা শিক্ষক নুরুল হক (৬০) উপজেলার মরিয়মনগর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মৌলভিপাড়ার বাসিন্দা। তিনি স্থানীয় শাহ মুজিব উল্লাহ মাজার হেফজখানার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তার মেয়ে ছালেহা বেগম (২৮) পূর্ব ইছামতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। 

সর্বশেষ গত বুধবার (২৪ আগস্ট) বাবার করা একটি মামলায় চট্টগ্রাম আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন ছালেহা বেগম।

ছালেহা বেগমের অভিযোগ, একেরপর এক মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি ও স্কুল থেকে চাকরিচ্যুত করাতে তার বাবা চেষ্টা চালাচ্ছেন। 

এর কারণ জানতে চাইলে ছালেহা বেগম মহানগর নিউজকে বলেন, ২০১৫ সালে আমার মামার সঙ্গে দেনা-পাওনার জের ধরে মায়ের সাথে ঝামেলা শুরু হয়। একপর্যায়ে আমার বাবা বাড়ি থেকে বের হয়ে অন্যত্র থাকা শুরু করেন এবং আরেকটি বিয়ে করেন। জানতে পেরেছি, তিনি আমাদের বাড়িটি স্থানীয় আমেরিকা প্রবাসী কাজী খালেদ ইমরানের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন।’ 

ছালেহা বেগম আরও বলেন, ‘এরপর খালেদ ইমরানের লোকজন আমাদের ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বললে মায়ের খোরপোষ ও ঘর বিক্রির কাগজপত্র অকার্যকর করে দেওয়ার আবেদন জানিয়ে নিম্ন আদালতের আশ্রয় নিই। তবে নিম্ন আদালত আমাদের আবেদন খারিজ করে দেন। এরপর উচ্চ আদালতে আপিল করি আমরা। সেখান থেকে বলা হয়, যত দিন এই মামলার রায় না হচ্ছে, তত দিন  ঘর বিক্রির বিষয়টি স্থগিত থাকবে এবং আমরা ওই ঘরেই থাকব।’ 

স্কুলশিক্ষক সালেহা বেগম বলেন, ‘উচ্চ আদালতের এই আদেশ অমান্য করে ২০২১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সকালে আমেরিকা প্রবাসী খালেদ ইমরানের প্রতিনিধি একই এলাকার বাসিন্দা মৃত ইব্রাহীম খলিলের ছেলে সেলিমের নেতৃত্বে ৪০-৫০ জন সন্ত্রাসী এসে আমাদের ওপর হামলা চালায়। তখন আমার মা হাসিনা আহমদ ও ভাই আবু তাহেরকে জখম করে এবং আমাকে ও আমার ১৬ বছর বয়সী বোনের শ্লীলতাহানি করে বাড়ি থেকে বের করে ঘরে তালা লাগিয়ে দেয়। এসব কিছুর ইন্ধনদাতা আমার বাবা নুরুল হক।’ 

স্কুলশিক্ষক ছালেহা বেগম আরও বলেন, ‘ওই দিন রাঙ্গুনিয়া থানায় মামলা করতে গেলে মামলা নিতে পুলিশ প্রথমে গড়িমসি করে। পরে আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানালে রাত ১০টার দিকে রাঙ্গুনিয়া থানা মামলা নেয়। এ ঘটনার দিন থেকে সন্ত্রাসীরা আমাদের ক্রমাগত হুমকি দিচ্ছে। ফলে উচ্চ আদালতের আদেশ থাকার পরও আমরা এখনও ঘরে যেতে পারিনি। কিছুদিন বোনের বাসায় ছিলাম, পরে শহরে ভাড়া বাসায় থাকছি। খুব মানবেতর জীবন যাপন করছি আমরা।’ 

ছালেহা বেগম অভিযোগ তুলে বলেন, ‘ঘরছাড়া করেও ক্ষান্ত হননি আমার বাবা। আমার স্কুলের চাকরি খেয়ে ফেলবেন বলে আমাদের আত্মীয়স্বজনের কাছে বলে বেড়াচ্ছেন। এমনকি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার থেকে শুরু করে অনেকের কাছে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করে আসছেন তিনি। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে মিথ্যা অভিযোগে জিডি করেছেন।’ 

ছালেহা বেগম বলেন, ‘এরই ধারাবাহিকতায় আমাকে হয়রানি করতে গত ২০ এপ্রিলের একটি মিথ্যা ঘটনা দেখিয়ে ২৫ এপ্রিল কোর্টে আমার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন বাবা। সেই মামলায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ২০ এপ্রিল বেলা ৩টার দিকে উপজেলার রোয়াজারহাট এলাকায় তার ওপর হামলা চালিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলতে চেয়েছি এবং তার কাছ থেকে টাকাপয়সা কেড়ে নিয়েছি। কিন্তু অভিযোগের সব কথা ছিল মিথ্যা ও বানোয়াট। আর সেদিন আমি স্কুল থেকেই এসেছি বিকেল ৪টার পরে। আর সেই মামলায় যারা সাক্ষী দিয়েছেন, তারা এর আগে আমাদের ওপর হামলা করে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলেন এবং সে বিষয়ে তারা তিন-চারটা মামলার আসামিও।’ 

স্কুলশিক্ষক ছালেহা বেগম আরও বলেন, ‘ওই মামলার তদন্ত আসে রাঙ্গুনিয়া থানায়। তবে রাঙ্গুনিয়া থানা এ বিষয়ে আমাদের কিছুই জানায়নি। তারা এক পক্ষের বক্তব্য নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটির সত্যতা পেয়েছে বলে রিপোর্ট দেয়। আর গত মঙ্গলবার জানতে পারি, সেই মামলায় আমার নামে ওয়ারেন্ট হয়েছে। শুনেই বুধবার আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিয়েছি।’ ছালেহা এবং তার মায়ের বিরুদ্ধে তার বাবা তিনটি মামলা করেছেন বলে জানান তিনি। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্কুলশিক্ষিকার বাবা নুরুল হক বলেন, ‘আমি একজন কোরআনে হাফেজ এবং তিনবার হজ করেছি। আমি কেন মেয়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করব? যা সত্য তার পরিপ্রেক্ষিতেই মামলা করেছি। আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার ঘটনাটি সত্য।’ 

নুরুল হক আরও বলেন, ‘জায়গা-জমির জন্যই আমার মেয়ে ছালেহা বিভিন্ন সময়ে আমাকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। ছালেহা ও তার মা আমার বিরুদ্ধে ১২টি মামলা করেছে।’ 

অন্যদিকে ছালেহার বাবা নুরুল হকের দেওয়া বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চাইলে সালেহা বলেন, ‘১২টি নয়, ৯টি মামলা করেছি আমরা। তা হচ্ছে পারিবারিক সুরক্ষা ও সহিংসতা মামলা ১১/ ২০২২, ভরণপোষণ মামলা ৬০৮/ ২১, কবলা অকার্যকর মামলা ১২২/ ২১, দেনমোহর ও খোরপোষ মামলা-৩/ ২১, সিআর মামলা ২৮০/ ২১ ও ৮৬/ ২১, জিআর মামলা ২২০/ ২১ ও ২২৮/ ২১) এবং তাঁর মায়ের করা যৌতুকের মামলা ১৪৩/ ২০। 

এর মধ্যে পারিবারিক সুরক্ষা মামলায় আদেশ হয় এবং গত ৬ জুন থানাকে জিনিসপত্র বুঝিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু রাঙ্গুনিয়া থানা এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ করেন স্কুলশিক্ষিকা ছালেহা বেগম। তিনি বলেন, ‘মূলত আমাদের ক্ষতিপূরণ না দেওয়ার জন্য মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে রাঙ্গুনিয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহাবুব মিলকী বলেন, ‘বাবা-মেয়ের ঝামেলা দীর্ঘদিনের। নুরুল হক তার স্ত্রী হাসিনার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় ডিভোর্স দেন। এর পরও হাসিনা তার সন্তানদের নিয়ে স্বামীর বাড়িতে থেকে যান। এর পর থেকেই মূলত তাদের মধ্যে মামলা ও পাল্টাপাল্টি মামলা শুরু হয়। অনেক দিন আগে থানায় একটি ভাঙচুরের মামলা ছাড়া সব  ক’টি মামলা দায়ের করা হয়েছে আদালতে। গত মঙ্গলবার একটি মামলায় মেয়ে ছালেহা বেগমের নামে পরোয়ানা এলেও তিনি পরদিন বুধবার আদালত থেকে জামিন নেন। এ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে কোনো পরোয়ানা নেই।’

এআই