রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

| ৯ আশ্বিন ১৪২৯

KSRM
মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
২০:৩৬, ২৫ মার্চ ২০২২

সরোজ আহমেদ

একাত্তরের রণাঙ্গন কাঁপানো কিশোরযোদ্ধার গল্প—পর্ব ১০

প্রকাশের সময়: ২০:৩৬, ২৫ মার্চ ২০২২

সরোজ আহমেদ

একাত্তরের রণাঙ্গন কাঁপানো কিশোরযোদ্ধার গল্প—পর্ব ১০

পৃথিবীর বুকে নিজের পরিচয়ে দাঁড়াতে মানুষকে কত বিপ্লব, সংগ্রাম করতে হয়েছে যুগের পরে যুগ। শুধু একখণ্ড মুক্ত মানচিত্রের আশায় কত জীবন যে ঝরে গেছে তার হিসেব নেই। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এদেশ শত্রুমুক্ত করেছে ছাত্র-শিক্ষক, যুবক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, পুলিশ, ইপিআর, আনসার, সেনাবাহিনীর জোয়ান, কৃষক-শ্রমিক তথা স্বাধীনতাকামী মানুষ। এ যুদ্ধে অনেক রক্তক্ষয় ও  ত্যাগ-তিতিক্ষার পর আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা, একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। আমাদের সবার প্রিয় মাতৃভূমি, বাংলাদেশ।

সেই যুদ্ধের গল্প তো আমরা অনেকই শুনেছি। কিন্তু এটা কি জানি, দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী এই যুদ্ধে বড়দের মতো লড়াই করেছে অগণিত শিশু-কিশোরও? তারা কখনও সরাসরি যুদ্ধ করেছে, কখনও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। কেউ কেউ জীবনবাজি রেখে গ্রেনেড হাতে ছুটে গেছে পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে। পলকেই উড়িয়ে দিয়েছে শত্রুদের আস্তানা।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের মধ্যে প্রায় ৪ লাখই ছিল শিশু-কিশোর। আর যে সব নারী সম্ভ্রম হারিয়েছিল তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল কিশোরি। তাই, মুক্তিযুদ্ধে শিশু-কিশোরদের অবদান কিছুতেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। 

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দেশমাতৃকার জন্য লড়াই করা দুরন্ত এবং দুর্ধর্ষ কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের গল্প ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। আজ ছাপা হলো দশম পর্ব। 

আতিকুল 

সিলেট মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার অন্তর্গত লাতু রেলস্টেশন। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে এই স্টেশনের অবস্থান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সেখানে পাকিস্তানি সেনারা ঘাঁটি করে। ১০ আগস্ট মুক্তিবাহিনী এ ঘাঁটিতে মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকটি দল ও উপদলে বিভক্ত হয়ে আক্রমণ চালায়। একটি উপদলের নেতৃত্বে ছিলেন দুর্ধর্ষ কিশোর একেএম আতিকুল ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এই কিশোর ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ৪ নম্বর সেক্টরের বড়পুঞ্জি ও জালালপুর সাব-সেক্টর এলাকায় যুদ্ধ করেন। তাঁদের সার্বিক নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন আবদুর রব। 

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একেএম আতিকুল ইসলামসহ মুক্তিযোদ্ধারা বিকেলে একযোগে আক্রমণ করেন লাতু রেলস্টেশনে পাকসেনা ঘাঁটিতে। দুই পক্ষে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। তীব্র আক্রমণ প্রতিরোধের চেষ্টা করতে গিয়ে হতাহত হয় বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা। আতিকুলদের সঙ্গে যুদ্ধে টিকতে না পেরে পাকিস্তানি সেনারা ঘাঁটি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এসময় বিপুল গোলাবারুদ ও কিছু অস্ত্রশস্ত্র ফেলে যায় তারা। ফলে ঘাঁটি দখল করে মুক্তিযোদ্ধারা সেখান থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান এবং সেখানে অবস্থান নেন।

এদিকে, লাতুতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রিইনফোর্সমেন্ট যাতে না আসতে পারে, সে জন্য মুক্তিবাহিনীর একটি দল কাট অফ পার্টি হিসেবে নিয়োজিত ছিল। কিন্তু তাঁরা বড়লেখা থেকে রিইনফোর্স হিসেবে আসা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়। ফলে লাতু ঘাঁটি দখলকারী মুক্তিযোদ্ধারা বেশ সংকটে পড়েন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নতুন এ দল লাতুতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের উপর ব্যাপক শেলিং শুরু করে। কিন্তু একেএম আতিকুল ইসলামসহ মুক্তিযোদ্ধারা বিচলিত না হয়ে সাহসিকতার সঙ্গে আক্রমণ মোকাবেলা করেন। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে যায়। তখন তাঁদের অধিনায়ক বাধ্য হয়ে পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত নেন।

এরপর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে যান। তবে এটা ঠিক, তাঁরা ঘাঁটি দখল করে তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হলেও এ ঘটনা পাকিস্তানিদের মনোবলে যথেষ্ট চিড় ধরাতে সক্ষম হন। 

যদিও লাতুতে আতিকুল ইসলামরা ব্যর্থ হয়েছেন, কিন্তু লুবাছড়ায় ব্যর্থ হননি। এ যুদ্ধের বর্ণনা আছে মেজর সিআর (চিত্তরঞ্জন) দত্তের (বীর উত্তম, পরে মেজর জেনারেল) বয়ানে। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সাদী (মাহবুব রব সাদী বীর প্রতীক) তাঁর দলের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে লুবাছড়া চা-বাগানে আক্রমণ চালান। দুইদিন তুমুল যুদ্ধের পর লুবাছড়া-কারবালা আমাদের হস্তগত হয়। পরে পাকিস্তানিরা বারবার চেষ্টা চালিয়েছে লুবাছড়া দখল করতে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়। লুবাছড়া শেষ পর্যন্ত মুক্ত ছিল।

মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের জন্য একেএম আতিকুল ইসলামকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। তিনি বর্তমানে সপরিবারে কানাডায় বসবাস করছেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার উত্তর নোয়াগাঁও গ্রামে। তাঁর বাবার নাম একেএম সিরাজুল ইসলাম, মা নসিবা খাতুন। স্ত্রী মারুফা ইসলাম। তাঁদের দুই ছেলে এক মেয়ে।

লেখক : গল্পকার ও সাংবাদিক

এআই