রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

| ৯ আশ্বিন ১৪২৯

KSRM
মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
১৮:১৯, ৪ মার্চ ২০২২

সরোজ আহমেদ

একাত্তরের রণাঙ্গন কাঁপানো কিশোরযোদ্ধার গল্প—পর্ব ৯

প্রকাশের সময়: ১৮:১৯, ৪ মার্চ ২০২২

সরোজ আহমেদ

একাত্তরের রণাঙ্গন কাঁপানো কিশোরযোদ্ধার গল্প—পর্ব ৯

পৃথিবীর বুকে নিজের পরিচয়ে দাঁড়াতে মানুষকে কত বিপ্লব, সংগ্রাম করতে হয়েছে যুগের পরে যুগ। শুধু একখণ্ড মুক্ত মানচিত্রের আশায় কত জীবন যে ঝরে গেছে তার হিসেব নেই। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এদেশ শত্রুমুক্ত করেছে ছাত্র-শিক্ষক, যুবক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, পুলিশ, ইপিআর, আনসার, সেনাবাহিনীর জোয়ান, কৃষক-শ্রমিক তথা স্বাধীনতাকামী মানুষ। এ যুদ্ধে অনেক রক্তক্ষয় ও  ত্যাগ-তিতিক্ষার পর আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা, একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। আমাদের সবার প্রিয় মাতৃভূমি, বাংলাদেশ।

সেই যুদ্ধের গল্প তো আমরা অনেকই শুনেছি। কিন্তু এটা কি জানি, দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী এই যুদ্ধে বড়দের মতো লড়াই করেছে অগণিত শিশু-কিশোরও? তারা কখনও সরাসরি যুদ্ধ করেছে, কখনও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। কেউ কেউ জীবনবাজি রেখে গ্রেনেড হাতে ছুটে গেছে পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে। পলকেই উড়িয়ে দিয়েছে শত্রুদের আস্তানা।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের মধ্যে প্রায় ৪ লাখই ছিল শিশু-কিশোর। আর যে সব নারী সম্ভ্রম হারিয়েছিল তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল কিশোরি। তাই, মুক্তিযুদ্ধে শিশু-কিশোরদের অবদান কিছুতেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। 

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দেশমাতৃকার জন্য লড়াই করা দুরন্ত এবং দুর্ধর্ষ কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের গল্প ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। আজ ছাপা হলো নবম পর্ব। 

রফিক
যেই বয়সে দৌড়ঝাপ আর খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সে যদি কেউ অস্ত্র হাতে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করে- ভাবতেই যেন অবাক লাগে। ১৯৭১ সালে বাঘা বাঘা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রাণপণ লড়াই করে এ দেশকে শত্রুমুক্ত করেছে অগণিত কিশোর। যাদেরকে রণক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর যোদ্ধা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে সিনিয়র মুক্তিযোদ্ধারা। 

মাত্র ষোল বছর বয়সে একাত্তরের রণাঙ্গনে লড়াই করেছেন এমন এক সাহসী কিশোর রফিক। পুরো নাম মো. রফিকউদ্দিন ভুইয়া। যুদ্ধকালীন ময়মনসিংহ জেলার ধোবাউড়া উপজেলার ঝিগাতলা গ্রামের শহিদ মফিজউদ্দিনের ছেলে রফিক পড়তেন দশম শ্রেণিতে। দেশের পরিস্থিতি দিন দিন কেমন পাল্টে যেতে থাকে। চারদিকে আওয়ামী লীগ নেতাদের জ্বালাময়ী বক্তৃতায় মুখর। নির্বাচন হয়েছে, তারপর কী হবে? রফিকের এত কিছু বোঝার বয়স হয়নি তখনও। তবে এটা বুঝতে পেরেছিলেন দেশে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। 

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বিষয়টা খানিকটা পরিস্কার হলো। শহর ছেড়ে মানুষ দলে দলে ফিরছে গ্রামে। সবার মুখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার খবর। বয়স কম হলেও রফিকও বুঝে গেলেন বাঁচতে হলে লড়তে হবে। 

২৯ মার্চ বিশজন বন্ধুর একটি দল ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন ভারতের উদ্দেশ্যে। সবাই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রথমে গেলেন ভারতের শিববাড়ি। ওখানে গিয়ে দেখলেন শত শত শরণার্থী। এক পর্যায়ে তাঁদের গ্রুপের কয়েকজন আলাদা হয়ে যান। ওখানকার একটা হাজং বাড়িতে রফিকসহ কয়েকজনের আশ্রয় হয়। এরপর একদিন কিশোর-যুবকদের তালিকা করে সবাইকে পাঠানো হয় ডালুতে। বারেঙ্গাপাড়া বাজার ছিল তার পাশে। ওটা ছিল একটা যুবশিবির। জুনের শেষ দিকে যুবশিবির থেকে রফিকদের পাঠানো হলো তুরা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। সেখানে জুলাই মাসের পুরো সময় প্রশিক্ষণ চলে। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে আবার ডালুতে আসেন রফিকরা। ওখানে তাঁদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়।
দেশে ফিরে ৪ আগস্ট রফিকদের প্রথম অপারেশন বন্দরঘাটা। কিন্তু রেকি ভাল না হওয়ায় আক্রমণ না করেই তাঁদের ফিরতে হয়। পরদিন ৫ তারিখ আবার মিশনে নামেন। বন্দরঘাটা বিওপি’র উত্তর দিকে সবাই পজিশন নেন। তখন ভোর ৪টা। রফিকদের অবস্থান ছিল রাস্তার উত্তর দিকে। জিয়াউদ্দিন কোম্পানি ফ্রন্টে। ডানে আলী কোম্পানি। বাঁ পাশে হাশেম কোম্পানি। কভারিং ফায়ারে ছিল ভারতীয় সৈন্যরা। তিনটা কোম্পানিই এডভান্স হয়ে গুলি করতে শুরু করে। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী নিরব। সুযোগ বুঝে রফিকরা সামনে এগোতে থাকে। তখন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে রাস্তায় পানি জমে গেছে। ফায়ার করতে করতে মুক্তিবাহিনী একেবারে পাক বাহিনীর ঘাঁটির কাছাকাছি চলে যায়। এবার পাক বাহিনীও গুলি চালাতে শুরু করে। অবস্থা বুঝে ভারতীয় কভারিং গ্রুপ মর্টার বর্ষণ করতে থাকে। মর্টারের আঘাতে বাঙ্কার থেকে আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিল একটু পর পর। 

এদিকে, রফিক চলে যান শত্রুদের গেটের একশ’ গজ সামনে। মুখোমুখি অবস্থান। রফিকের বাঁ পাশে ছিল রিয়াজউদ্দিন। শত্রুর ঘাঁটির দিকে উড়ে যাওয়া মর্টার শেলগুলো দেখার জন্য মাথা উঁচু করতে গিয়ে পাকিস্তানিদের একটি গুলি এসে লাগে রিয়াজউদ্দিনের মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করেন রিয়াজউদ্দিন। এখন রিয়াজউদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। তখন রফিক এবং মুক্তিযোদ্ধা কাদের রিয়াজকে পিঠে নিয়ে ক্রলিং করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় শোনা গেল হালুয়াঘাট থেকে পাকিস্তানিরা আরও শক্তিশালী হয়ে এগিয়ে আসছে। এ অবস্থায় পিছু হটার নির্দেশ দিলেন কমাণ্ডার।

এদিকে, রফিকরা দুইদিন ধরে অভুক্ত। তারওপর টানা বৃষ্টিতে লড়তে গিয়ে শরীর ভিষণ ক্লান্ত। পিছু হটতে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান সবাই। শেষ পর্যন্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রিয়াজউদ্দিনের লাশ নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। সবাইকে ক্রলিং করে পিছু হটতে হচ্ছিল। ভিষণ বন্ধুর পথ। কখনো পাহাড়, কখনো ছোট নদী, খাল, ছড়া পাড়ি দিতে হচ্ছে। হঠাৎ একটা বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় বোমার একটি স্পিøটার রফিকের হাতের কনুই আর কবজির মাঝামাঝি অংশে এসে লাগে। আর সঙ্গে সঙ্গে মাংসপেশি ছিঁড়ে ঝুলে যায়। সাথে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা চাইলেন রফিক। কিন্তু ওই পরিস্থিতিতে তাঁকে সহযোগিতা করার মত অবস্থা ছিল না। এর মধ্যে আরেক মুক্তিযোদ্ধার পুরুষাঙ্গে গুলি এসে লাগে। সবমিলে ভয়াবহ পরিস্থিতি। 

রফিক বিচ্ছিন্ন হওয়া মাংসটাকে গামছা দিয়ে হাতের সঙ্গে পেঁচিয়ে নেন। বৃষ্টির মত গুলি চলছে তখনও। একটু সামনে গিয়ে দেখেন একটা মাটির ঘর। কোনও রকমে সেখানে ঢুকে কয়েক মিনিট বিশ্রাম নেন রফিক। কিন্তু মাটির ঘরে গুলি থেকে সাময়িক রক্ষা পেলেও যেভাবে বোমা বর্ষণ হচ্ছিল যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরণের বিপদ ঘটে যেতে পারে। তাই দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু এবার একটি নদী পেরুতে হবে। নদীটা খুব গভীর নয়, পাহাড়ি ছড়ার চেয়ে একটু বড়। তবে মুষলধারে বৃষ্টির কারণে প্রচণ্ড স্রোত বইছে। নদীর পাড়ে বসে রফিক ভাবছিলেন, আহত অবস্থায় কিভাবে নদী পার হবেন। দূর থেকে কমান্ডার বিষয়টি আঁচ করতে পেরে আলী নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকে পাঠালেন রফিককে নদী পার করিয়ে দিতে। আলী বেশ লম্বা এবং দুর্দান্ত সাহসী যুবক। রফিককে পিঠে নিয়ে নদী পার করিয়ে দিলেন ওই যুবক। 
নদীর তীরে উঠার পর রফিকের হাত থেকে খুব রক্ত ঝরছিল। এই দেখে তাঁকে একটি বাড়িতে নিয়ে গেলেন সহযোদ্ধারা। সেখানে একজনের কাছ থেকে একটা গামছা এনে রফিকের পেটে বেঁধে দিলেন। রফিক তখন বুঝতে পারেন তাঁর পেটেও স্পিøন্টার লেগেছে। রফিক হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যাম্পে। 

রফিকের যখন জ্ঞান ফিরে তখন খিদা আর পানির পিপাসায় অস্থির। কোত্থেকে এক সহযোদ্ধা দুটি রুটি এনে খাওয়ালেন। তারপর আগষ্টের ১২ তারিখ তাঁকে গৌহাটি আর্মি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা চলে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ইতোমধ্যে দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। দেরিতে হলেও স্বাধীন দেশে ফিরে আসেন রফিক।

কিন্তু দেশে ফিরে দেখেন বাড়িঘরের চিহ্ন নেই। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সব পুড়িয়ে দিয়েছে। রফিক মুক্তিবাহিনীতে যাওয়ার কারণে তাঁর বাবা মফিজউদ্দিনকে বস্তায় ভরে নদীতে পেলে নৃশংসভাবে খুন করেছে ওই বর্বর বাহিনী। মা, ভাই জীবন বাঁচাতে এলাকা ছেড়েছে। অবশেষে এক মাস পর হারানো মা, ভাইকে খুঁজে পান কিশোর মুক্তিযোদ্ধা রফিক। 

লেখক : গল্পকার ও সাংবাদিক
 

এআই