শুক্রবার ০৯ ডিসেম্বর ২০২২

| ২৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

KSRM
মহানগর নিউজ :: Mohanagar News

প্রকাশের সময়:
১৬:৩২, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২

সরোজ আহমেদ

একাত্তরের রণাঙ্গন কাঁপানো কিশোরযোদ্ধার গল্প—পর্ব ৮

প্রকাশের সময়: ১৬:৩২, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২

সরোজ আহমেদ

একাত্তরের রণাঙ্গন কাঁপানো কিশোরযোদ্ধার গল্প—পর্ব ৮

পৃথিবীর বুকে নিজের পরিচয়ে দাঁড়াতে মানুষকে কত বিপ্লব, সংগ্রাম করতে হয়েছে যুগের পরে যুগ। শুধু একখণ্ড মুক্ত মানচিত্রের আশায় কত জীবন যে ঝরে গেছে তার হিসেব নেই। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এদেশ শত্রুমুক্ত করেছে ছাত্র-শিক্ষক, যুবক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, পুলিশ, ইপিআর, আনসার, সেনাবাহিনীর জোয়ান, কৃষক-শ্রমিক তথা স্বাধীনতাকামী মানুষ। এ যুদ্ধে অনেক রক্তক্ষয় ও  ত্যাগ-তিতিক্ষার পর আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা, একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। আমাদের সবার প্রিয় মাতৃভূমি, বাংলাদেশ।

সেই যুদ্ধের গল্প তো আমরা অনেকই শুনেছি। কিন্তু এটা কি জানি, দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী এই যুদ্ধে বড়দের মতো লড়াই করেছে অগণিত শিশু-কিশোরও? তারা কখনও সরাসরি যুদ্ধ করেছে, কখনও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। কেউ কেউ জীবনবাজি রেখে গ্রেনেড হাতে ছুটে গেছে পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে। পলকেই উড়িয়ে দিয়েছে শত্রুদের আস্তানা।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের মধ্যে প্রায় ৪ লাখই ছিল শিশু-কিশোর। আর যে সব নারী সম্ভ্রম হারিয়েছিল তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল কিশোরি। তাই, মুক্তিযুদ্ধে শিশু-কিশোরদের অবদান কিছুতেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। 

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দেশমাতৃকার জন্য লড়াই করা দুরন্ত এবং দুর্ধর্ষ কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের গল্প ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। আজ ছাপা হলো অষ্টম পর্ব। 

মোজাম্মেল 

অগণিত সাহসী যোদ্ধার ভিড়ে লড়াকু কিশোর মোজাম্মেল হক অন্যতম। তিনি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। পড়তেন ঢাকার স্টাফ ওয়েলফেয়ার হাইস্কুলে। স্কুল জীবন থেকে দেখেছেন বাঙালি অবাঙালির বৈষম্য। কারণে অকারণে অবাঙালিরা বাঙালিদের হেনস্তা করছে। যা দেখে মোজাম্মেল হকের ছোট্ট মনে ক্ষোভ জমে। প্রচণ্ড ক্ষোভ।

তাঁদের বাড়ির কাছেই ছিল সেনানিবাস। পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রায় আসা যাওয়া করত তাঁদের গ্রামে। গ্রামের প্রায় সবাই ছিলেন কৃষক। মোজাম্মেলের বাবাও। গ্রামের লোকজনকে খুব হয়রানি করত পাক সেনারা। একদিন এলাকারই এক নতুন দম্পতি গ্যারিসন সিনেমা হলে গিয়েছিলেন সিনেমা দেখতে। এ সময় বউটাকে ধরে নিয়ে যায় কিছু পাক সেনা। প্রতিবাদ করায় স্বামীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে বেধড়ক পিটানো হয়। এসব দেখে টকবগে কিশোর মোজাম্মেলের মনে প্রতিশোধে আগুন জ্বলতে থাকে। যখন যুদ্ধ যুদ্ধ শুরু হলো মোজাম্মেল আর বাসায় বসে থাকতে পারলেন না। শরীরে তখন তারুণ্যের জোয়ার। 

কুমিল্লা সীমান্ত পেরিয়ে মোজাম্মেল চলে গেলেন মেলাঘর ক্যাম্পে। সেখানে মেজর হায়দারের সঙ্গে দেখা হয়। কিন্তু মেজর হায়দার মোজাম্মেলকে দেখে সাফ বলে দিলেন, এত ছোট ছেলেকে নেওয়া যাবে না। কিন্তু হতাশ হলেন না মোজাম্মেল। যার বুকে দেশপ্রেমের প্রদীপ জ্বলছে তাঁকে থামানোর সাধ্য কার? 

মোজাম্মেল সাহসের সঙ্গে মেজরকে বললেন, আমার বাড়ি সেনানিবাসের কাছে। আমি সেনাদের অনেক কিছুই দেখেছি। আমার সাহস আছে যুদ্ধ করার। এ কথা শুনে মেজর বুঝতে পারলেন, ছেলে ছোট হলেও কিছু একটা করতে পারবে। দৃঢ় মনোবলের কারণে অবশেষে মোজাম্মেলকে মুক্তিবাহিনীর দলে নিতে বাধ্য হলেন মেজর। 

মেজর হায়দার নিজেই মোজাম্মেলকে এক্সপ্লোসিভ প্রশিক্ষণ দিলেন। একই সঙ্গে কিভাবে গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে হয়, কিভাবে সাধারণ অস্ত্র চালাতে হয় তাও শিখিয়ে দিলেন। তারপর কিশোর মোজাম্মেল ফিরে এলেন ঢাকায়। 

কিন্তু ফেরার পথে ঘটে আরেক বিপত্তি। কুমিল্লার একটি জায়গায় সিএন্ডবি রোড পাড়ি দিতে গিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যের মুখোমুখি হয়ে যায়। এ সময় মোজাম্মেলরা অস্ত্র ফেলে আবার ভারতে চলে যান। তখন মেজর হায়দার ওদের অস্ত্র ফেলে ফিরে যাওয়াটা ভাল মনে করেননি। তিনি বললেন, ওরা যে কাজ করে ফেলেছে তাতে মনে হয় না ওদের কারও যুদ্ধ করার সাহস আছে। সুতরাং ওদের আর ভিতরে পাঠানো যাবে না। এই কথা শোনার পর মোজাম্মেল কেঁদে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত বুঝি আর যুদ্ধ করা হবে না। মোজাম্মেল মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, যে করেই হোক তাঁকে যুদ্ধ করতেই হবে। পাকিস্তানি সৈন্য না মারা পর্যন্ত তাঁর মনে শান্তি নেই। 

মোজাম্মেল প্রতিদিন একটা কাজ করতেন। মেজর হায়দার সাহেব বিশ্রামের সময় যেই জায়গায় বসতেন, এর আশপাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। একদিন মেজর হায়দার সাহেবের নজরে আসে বিষয়টি। তাঁকে ডেকে জানতে চাইলেন, এভাবে রোজ এই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার কারণ কি?

কথা বলার সুযোগ পেয়ে মোজাম্মেল সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠলেন, স্যার আমাদের ঢাকায় পাঠান। আমরা গেরিলা যুদ্ধ করতে চাই। 
হায়দার সাহেব জবাব দিলেন, তোমরা কিভাবে যুদ্ধ করবে? তোমাদের যে সাহস নেই তার প্রমাণ তো নিজেরাই দিয়েছো।
‘স্যার, আমরা সেনানিবাসের কাছের মানুষ। যে কোনও সাহসী কাজ করতে পারবো।’ মোজাম্মেলের কথা শোনে হায়দার সাহেব বললেন, কাকে মেরে আসতে পারবে? 

মোজাম্মেল হক একটু চিন্তা করলেন কার নাম বলা যায়। হঠাৎ মনে এলো মুসলিম লীগ নেতা ও সাবেক স্পিকার আব্দুল জব্বার খানের নাম। সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, আব্দুল জব্বার খানকে মারতে পারবেন। এ সময় হায়দার সাহেবের সামনে বসা ছিলেন জব্বার খানের ছেলে বাদল খান। হায়দার সাহেব মোজাম্মেলের কাঁধে আলতু একটা থাপ্পর মেরে বললেন, মোনায়েম খাঁকে মারতে পারবে?

মোনায়েম খাঁকে আগের থেকে চিনতেন মোজাম্মেল হক। বিভিন্ন সময় ওই বাড়িতে যাওয়া-আসা ছিল তাঁর। কাজেই কাজটি তাঁর জন্য সহজ বলে মনে হলো। তাই আর দেরি না করে হায়দার সাহেবের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন কিশোর মোজাম্মেল। 

এরপর প্রয়োজনীয় অস্ত্র দিয়ে মোজাম্মেল হকসহ একটা গ্রুপকে ঢাকায় পাঠানো হলো। তাঁরা ঢাকায় এসে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেন।

যুদ্ধকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গর্ভনর মোনায়েম খাঁনের বাড়িতে কাজ করতেন মোজাম্মেলের চাচা আব্দুল জব্বার। চাচার সঙ্গে মিলে এক মহাপরিকল্পনা আঁটলেন কিশোর মোজাম্মেল। মিশন সাকসেস করতে সখ্যতা গড়ে তুলেন মোনায়েম খাঁনের বাসার আরও দুই কাজের লোক শাহজাহান ও মোখলেসুর রহমানের সঙ্গে। ওরাও নানা কারণে মোনায়েম খাঁর ওপর ক্ষুদ্ধ। ওরা বেশ কয়েকবার কাজ করবে না বলে পালিয়ে গিয়েও রক্ষা হয়নি। মোনায়েম খাঁ পুলিশ দিয়ে ওদের ধরে এনে আবার কাজ করতে বাধ্য করেছে। ফলে এই দুই কাজের লোককের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে অপারেশন করাটা নিরাপদ মনে করলেন মোজাম্মেল।  

তবে অক্টোবর মাসে দুইবার স্বাধীনতা বিরোধী মোনায়েম খাঁনকে মারার পরিকল্পনা করেও ব্যর্থ হলেন মোজাম্মেল। কিন্তু ক’বার আর পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে? তৃতীয়বার ঠিকই সফল হলো মিশন।

এবার পরিকল্পনা মাফিক একদিন সন্ধ্যায় মোজাম্মেল গেলেন মোনায়েম খাঁনের বাসভবনে। তখন মোনায়েম খাঁন ছিলেন ড্রয়িংরুমে। বাড়ি পাহারায় অসংখ্য পাকিস্তানি সেনা। এর মধ্যে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে কৌশলে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়লেন সাহসী কিশোর যোদ্ধা মোজাম্মেল। সঙ্গে ছিলেন আনোয়ার নামে আরও একজন মুক্তিযোদ্ধা। 

পা টিপে টিপে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন মোজাম্মেল ও আনোয়ার। এদিক ওদিক আরেকবার দেখে নিয়ে স্টেনগান বের করে তাক করলেন মোনায়েম খাঁনের দিকে। এরপর কিছু বোঝে ওঠার আগেই টিপে দিলেন স্টেনগানের ঘোড়া। গুলি লেগে মোনায়েম খাঁ ঢলে পড়ে মেঝেতে। ব্যস, মিশন সাকসেস। তারপরও ভেতরে একটা গ্রেনেড ছুঁড়ে মারেন আনোয়ার। কিন্তু গ্রেনেড বিস্ফোরণ হলো না। এ অবস্থায় আর দেরি না করে দেয়াল টপকে মোনায়েম খাঁর বাড়ি থেকে চলে এলেন বিচক্ষণ কিশোর মোজাম্মেল। একটু পর বেরিয়ে এলেন আনোয়ার, শাহজাহান ও মুখলেস। আর দেরি না করে সবাই পালিয়ে এলেন নিরাপদ জায়গায়। এর মধ্যে ক্যান্টনমেন্ট, গুলশান, বনানী এমনকী মোনায়েম খাঁর বাড়ি থেকে শুরু হয় বৃষ্টির মত গুলি। 

পরদিন রেডিও পাকিস্তানে খবর এলো, ‘গত রাতে আততায়ীর গুলিতে আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তির পর মারা গেছেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানঁ।’ অসীম সাহস আর বুদ্ধি না থাকলে এমন একটি ভয়ানক মিশন সফল করা সহজ কথা নয়। 

লেখক : সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী
 

এআই